এই ভিনি, জানলার পাশে বসে কি এত ভাবছিস শুনি? টিভিতে দেখলি সাইক্লোন এর খবর! আমাদের এখানেও নাকি ধেয়ে আসছে। ওরা আবার ঝড়ের ও গাল ভরা নাম দিয়েছে, পারেও বটে। জানিস আজ তোর জন্য একটা জিনিস এনেছি, বাজারে গিয়ে চোখে পড়তেই... এই মেয়ে, আমি যে এত গুলো কথা বলে গেলাম, তা তোর কানে গেছে? এই ভিনি, এই... উফ পারি না আর, ঢং দেখে আর বাঁচি না। না ওঠ তো, অনেক হলো তোর এই প্রেম প্রেম খেলা। শিগগিরই চল, ঘরে যে অনেক কাজ বাকি। ওই শুনছিস? এই মেয়ে... তোর কপালে কিন্তু অনেক দুঃখ বলে দিলাম।... এভাবেই গজ গজ করতে করতে চলে গেল প্রিয়া। ভিনি তবু জানলার বাইরে অসীমের দিকে তাকিয়ে। ঘরের এই চার দেওয়াল ছাড়িয়ে সে হারিয়ে যেতে চায় একা। তার কোন পিছুটান নেই। আজ সে সব হারিয়েছে, তাই আর নতুন করে হারানোর ভয় নেই। আজ সে নিজেই তার ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতে পা বাড়িয়েছে। এছাড়া আর উপায় ই বা কি ছিল তার। অফিসের ই একজন কে সে ভালোবাসে। শিরিষ, একজন অসাধারন মানুষ। ভিনি প্রথম থেকেই তাকে পছন্দ করত। তার কথা বলা, তার স্বভাব, তার হাসি, তার চোখ, তার সবকিছুই যেন কে ভিনি কে আষ্টে পিষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। আস্তে আস্তে সময়ের সাথে তারা একে অপরের কাছে এসেছে। তার সাদাকালো জীবনের ক্যানভাসে হাজার রঙের তুলি বুলিয়েছে সে। নাম না জানা নদীর তুমুল ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, আর ভিনিও নিজেকে ভাসিয়েছে কোনো এক অজানা সুখের খোঁজে। যখন সবকিছুই ভালো, তখনই পথের মাঝে বাধা আসে। আর এ বাধা, ভিনি নিজে, শিরিষের বিবাহিত জীবনে। শিরিষ শুধু একজন দায়িত্বশীল স্বামী নয়, সে একজন সুন্দর ফুটফুটে সন্তানের বাবাও! সে কখনো তার সুখের জীবনে আস্ত একটি কাঁটা ঝোপ কে বাড়তে দেবে না। সে তার পরিবার কে যে ভীষন ভালোবাসে। তবু ভিনি জোর করেই তার জীবনে নিজের জায়গা খুঁজে নিতে চায়। শিরিষ ও তাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে, যা হয়ত ভিনির প্রাপ্য ই ছিল না। এভাবেই দিন এগিয়ে চলতে লাগল। শিরিষের জীবনে অনেক ভারসাম্য হারিয়েছে। তার একমাত্র কারন ভিনি। শিরিষের অনেক বারণ সত্ত্বেও সে জোর করেছে তাকে। ভিনির মুখের দিকে চেয়ে, শিরিষ সব কষ্ট, দুঃখ সয়ে গেছে একা! যত সে আঁকড়ে ধরেছে, ওর জীবনে কষ্ট তত ই বেড়েছে। ভিনি সবসময় ভেবেছে সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্ত না, সে ভুল ছিল। আজ তাই সে সরে যাবে অনেক দূরে। শিরিষ তাকে বলেছে মৃত্যু নাকি সবকিছু সমস্যার সমাধান নয়। আজ তাই জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে, তার কথা মনে রেখেই সে বাঁচবে, কিন্তু কতদিন! যখন মনের মৃত্যু হয়, শরীর কি পারে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে জীবন সংগ্রামে.. শিরিষ কি বোঝে, এ জীবন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর?! ভিনি সরে যাবে অসীমে, জানলার বাইরের আকাশ তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে....... ক্রমশ!
আজ অনেকদিন পর আবার একটি গোটা বই গোগ্রাসে গিললাম। গিললাম কারণ, অনেকের মতে আমি নাকি না বুঝেই শুধু বই পড়ি। লেখার মর্ম নাকি উপলব্ধি করতেই পারি না। কিন্তু মোটেও তা না! অনেক মানুষের চেয়েই আমি মনের কথা, ওই কালো অক্ষর গুলোকে ভালো বুঝি... মাঝে মাঝে মনে হয়, ভাগ্যিস আমি বই এর পোকা। যদি বই পড়তে না ভালোবাসতাম তাহলে পৃথিবীর এত সহস্র গুপ্তধন আমার অধরা রয়ে যেত। আমার একাকিত্ব কাটানোর রসদ খুঁজে পেতাম না। কখনো সৃষ্টির আনন্দ পেতাম না। প্রতিটি বই কে আমি কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে চাই।।
গরম শেষের দিকে। হালকা বর্ষার ভাব এসেছে। প্ৰকৃতি তার রূপ পাল্টাচ্ছে আর মানুষ তার মন। হঠাৎ ই ছেলেটির সাথে মেয়েটির দেখা। শান্ত স্বভাবের মিষ্টি ছেলে। মেয়েটি ডানপিটে, বেশি কথা বলে, বোধহয় বছর সাতেক এর ছোট ছেলেটির থেকে। বেশ কিছুদিন সাধারণ দেখা, কথা তখনও হয় নি। তখনও বোধহয় তারা কেউই জানত না, কি ঘটতে চলেছে। বিধাতা বোধহয় তখন গল্প লিখতে ব্যস্ত ছিলেন। কিছুদিন পর, গাছের মলিন পাতায় সবুজের ছোঁয়া লাগল। মেঘেরা যে কোন ঝগড়ায় মাতল, তা তারই জানে। মোটে শান্ত হয় না, গুর গুর করে তারা ডেকেই চলল। কোনো সন্তান সম্ভবা মা গাছের কোটরে আশ্রয় নিল। কালো আকাশের নিচে, অ থৈ জলরাশি। গাছের ফুল ও তার সুগন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে বন্যার জলে। মেয়েটি ভিজে চুপচুপে, আর ছেলেটি ও তার দায়িত্ব পালন করতে ভোলেনি এই ভরা বর্ষাতেও। নেহাতই কাজের ছলে পরিচয় শুরু, এই বুঝি ছিল বিধাতার মনে। বাড়ি ফেরার সময়, একচিলতে হাসি মেয়েটিকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অজানা প্রেমের স্রোতে। একে যে চোরাবালি, তার উপর আবার তাসের প্রাসাদ.. আহা কি সখ মেয়ের। কত গঞ্জনা, কত ধিতকার। তবু মেয়ে মানবার পাত্রী নয় মোটে। তার যে সেই বর্ষা দিনের সোনার হরিণ ই চাই, তাতে তার প্রাণ গেলেও তার আক্ষেপ নেই। কিন্তু সে যে কাউকে বোঝাতে পারেনা তার মনের কথা। আর অপর জন সোনার হরিণ ই বটে। সে মেয়েটির জীবনে সোনার কাঠি ছুঁয়ে যায়, আর রূপকথার মত সব সুখ তার কাছে এসে ধরা দেয়। আর পরক্ষনেই সে তার সোনার পরশ নিয়ে ছুটে চলে গভীর অরণ্যে, যেখানে তাকে ধরার সাধ্যি কারো নেই। মেয়েটির কষ্টে হয়ত তার কখনো কষ্ট হয়, হয়ত সেও কখনো হারিয়ে ফেলে নিজেকে। হয়ত, এ ও নিছক মেয়েটির কল্পনা। তবে সে বারবার মেয়েটিকে তার সুখ ফিরিয়ে দেয়। বারবার শুকনো গাছে সবুজ পাতা আসে, ফুলের কুঁড়ি হয়। কিন্তু গাছ জানে, এ বেশিদিন নয়, একদিন তাকে শুকিয়ে যেতে হবে। সোনার হরিণ ও আর আসবে না, তার কষ্ট বুঝবে না। তবু মেয়েটি সেই বর্ষার প্রেম ভুলবে না!!!
বেনু, তুমি কেমন আছো? আজকাল আর কিচ্ছু ভালো লাগে না। সারাদিন শুধু সেদিন এর দিনগুলোতে ভেসে বেড়াই। মাঝে মাঝেই মনে হয় শেষ বুঝি ঘনিয়ে এলো। ভাবছ বুঝি, কিসের শেষ? না গো না, সে শেষের গপ্পো তোমাকে বলব না। আমি সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি শুধু ভাবি, কখনো হাসি, আবার কখনো ডানপিটে চোখের জল মোটে বাধা মানে না। মন টিও বড় অবুঝ, সেই ছোট্ট বেলা থেকে বেটা কে বাগে আনতে পারলাম না। সারাদিন সে চোখের পাতায় রঙ তুলি নিয়ে ছবির মেলা বসায়। এমন দুষ্ট , সে নিজেই অতীতের কালো রঙ এ সে ছবি নষ্ট ও করে দেয়। ও বেনু, তোমার মনে পরে সেই ছেলে বেলার কথা? সেই প্ৰথম, তোমার সে কি রূপ, কি দাপট। ভুলতে পারিনা আজও। তখন তুমি ছিলে অজানা অচেনা একজন মানুষ। বুঝি আজও তাই। তবু পরিচয় হল। অনেকটা , না না কিছুটা কাছে এলে অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব নিয়ে। অনেক ভালো মন্দ সময়ের ভিড়ে সেই দিনগুলো শুধুই আমাদের। সেই সময় হাটঁতে গিয়ে পিছিয়ে পড়তাম, আর সেই তুমি আমাকে রাস্তা দেখিয়েছিলে, কথা দিয়েছিলে একসাথে চলার। তবু এ রাস্তায় আমি আজও একা। সেই গভীর রাতের কথা মনে পড়ে? তোমাকে জড়িয়ে নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফেরা। কত শত রাত তোমাকে ভেবে কাটানো। কত রাত তোমার মনে মন মেলানো। আজ সবই শুধু স্মৃতি। সেই শীতের রাতে নদীর জলে মিশে গিয়েছিল আমাদের ভালোবাসার আবেগ। বুকের মাঝে আঁকড়ে ধরে, আলতো ঠোঁটের ছোঁয়া জীবনের সব সুখ এনে দিয়েছিল সেই এক মুহূর্তে। প্রকৃতির স্তব্ধতা বলে দিয়েছিল এ সুখ ক্ষনিকের। সত্যিই তাই, আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম তোমাকে। একটু ভুল বললাম কি? তাই তো, সেই তুমিই যে আমাকে দূরে সরিয়ে দিলে, এ কে কি হারানো বলে? কে জানে! দূর দূর, এ সব মন খারাপের কথা বলে আমি যে তোমার মন ও ভারী করে দিলাম। তুমিও যেমন, আমাকে এত কিছু বারন কর, মন খারাপের কথা বলতে বারন করলে না কেন শুনি? আরে, বাইরে যে মেঘ করেছে গো, ঘন কালো মেঘ। সেই সোনাঝুরি র দিন গুলোর মতো। গরম কালের বিকেল বেলা, কালবৈশাখী র পর, তুমি আর আমি বাঁশের মাচায় বসে কতই না সুখের দিন কাটিয়েছি। সেই সোঁদা মাটির গন্ধ, গাছের পাতার টুপ টাপ করে পড়া জল , গরম মাটি থেকে বেরানো তাপ আর বৃষ্টির পর ঠান্ডা হাওয়া সবই আমার মন ছুঁয়ে যায়। সেই কাদামাটির পথে তুমি আর আমি হাত ধরে হেঁটেছি, কতই না মধুর স্মৃতি। আর খোয়াই। তাকে যে ভোলা যায় না, সে যে তোমার স্বপ্ন ছিল। মনে পরেআজও খোয়াই বয়ে চলে নিজের ছন্দে, কখনো কখনো ছুঁয়ে যায় আমাদের মতোই দুজনের পা। ...... আর কখনো এ লেখা শেষ হবে না... রইল অসমাপ্ত।
যদিও সবসময় কিছু বলার থাকে না, তবু মন টা অকারনেই কিছু বলতে চায়। চারপাশে প্যাচ প্যাচে গরম, তাই ঠান্ডা হাওয়ার আশায় চান করে ছাদে উঠলাম। ফুরফুরে হাওয়া আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল ভালোলাগার দিনে। মেঘবালিকা! হ্যাঁ একটি ছোট্ট মেয়ে। বড় অদ্ভুত তার জীবন। ছোট বেলা থেকেই পড়া শোনা তে খুব ভালো, শান্ত শিষ্ট, কখনো দুস্টুমি করে না। হাতেগোনা কয়টি মাত্র বন্ধু, তবে তার বন্ধুদের সে খুব ভালোবাসে। কিন্তু কেউ যে তাকে বোঝে না! সে তার নিজের শৈশব ছেড়ে বড় হয়েছে, কিন্ত সে তার দিনগুলো ভুলতে পারে নি। বড় হওয়ার পথে, সে যে কখন বদলে গেছে, সে নিজেও টের পায় নি। ছোট্ট বেলার শান্ত মেয়েটি হয়েছে ভারী দস্যি! সুনামের বদলে কলঙ্ক ই জুটেছে তার। কখনো কাউকে বোঝাতে পারেনি সে তার মনের গভীরতা। সবাই তার দিকে আঙ্গুল তুলে প্রশ্ন করেছে মাত্র, উত্তর শোনার আগ্রহ কারোর ছিল না। এভাবেই গঙ্গা ছেড়ে খালের জলেই তার জীবন চলছিল। তারও বুঝি সবটুকু শক্তি ফুরিয়ে ছিল, তাই সেও ছিল নির্বিকার। মেঘবালিকার পবিত্র সাদা রঙে শুধুই কালো মেঘের আবরণ। কালো মেঘের ভিতর টল টলে জলের উপস্থিতি যে সবার অজানা। যখন বাইরের কঠিন গরম হাওয়ায়, মেঘের রঙ নিকষ কালো, সে আর কারো পরোয়া করে না, ঠিক তখনই.......... সে আসে!!! মেঘবালিকা কে হার মানতে হয়.. সে তার ভিতরের জলরাশি আটকে রাখতে পারে না, কখনো কান্না, কখনো প্রেম হয়ে উপচে পড়ে, তারই বুকে। আরো আরো বেশি ঘন হয় আবেগ। তার ভালোবাসা, আঘাত, আদর এ মেঘের রঙ বদলায়। বদলায় মেঘের জীবন। তার প্রতি স্পর্শে , মেঘবালিকা পূর্নতা পায়। তার স্পর্শ যে ভালোবাসার, কলঙ্কহীন। নিকষ কালো কলঙ্কের রঙ ধীরে ধীরে লাল রঙে পালটে যায়। ভাবছ বুঝি লাল রঙ কিসের?? মেঘবালিকা তার উষ্ণ আদরে লজ্জায় রাঙা হয়ে ওঠে। ভালোবাসা বুঝি এমন ই হয়, দস্যি মেয়েও ধরা দেয় কারো বাহুডোরে!!!!
সেই ছোট্ট বেলার গল্প গুলো আজও আমাকে নাড়া দেয়। কত সুন্দর সুন্দর গ্রাম আর তার মধুর সব গল্প। গ্রামের ছোট মাটির ঘরে, তালপাতার ছাউনি... পাশে কত রকমের গাছ, পুকুর, বাঁশের বেড়া। জানো ওই ঘরে কাদের বাস?? ওই ঘরে আমার স্বপ্নের দেশ সাজানো.. আমার মাঝে মাঝেই বেশ ইচ্ছে করে, তুমি হবে ওই গ্রামের চাষী আর আমি তোমার নতুন বউ। লাল টুকটুকে শাড়ি, খোঁপায় বকুল ফুলের মালা, হাতে রঙিন চুড়ি পড়ে নতুন বউ সাজবো। তোমার জন্য কাঠের জ্বালে রান্না করব। আর যখন তুমি মাঠ থেকে ফিরবে, আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব। স্নান সেরে তুমি আমার কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরবে, আর আমি তোমাকে ঠেলে দিয়ে দৌড়ে পালাবো। আমার বেশ লাগবে, যখন তুমি আমাকে জোর করে তোমার বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরবে। আমি মন ভরে তোমার শরীরের আভাস নেব। একটা ছোট্ট মিষ্টি সংসার...পলকে পলকে ভালোবাসায় ভরে যাবে জীবন!!